নিজস্ব প্রতিবেদক: ঈদের ছুটিতে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে পর্যটকের ঢল নেমেছে। ঈদের দিন থেকে দলে দলে পর্যটক আসছেন। তারা প্রিয়জন নিয়ে উদ্যানে ঘুরছেন। গভীর অরণ্যে হারিয়ে যেতে যেতে উপভোগ করছেন প্রকৃতির অকৃত্রিম সৌন্দর্য। তাদের স্বাগত জানাচ্ছে, সুশোভিত বৃক্ষরাজি ও নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী।
উদ্যানের পাশে আছে চা বাগান ও তেলিয়াপাড়া স্মৃতিসৌধ। উদ্যানে আছে থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা। নিরাপত্তাতেও ঘাটতি নেই।
করোনাভাইরাসের কারণে দুই দফায় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ও রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। এর পর থেকেই পর্যটকদের সমাগম বাড়ছে। কিন্তু, ঈদের ছুটিতে পর্যটকের ঢল নেমেছে। তাদের নিরাপত্তার জন্য সাতছড়িতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। সাজানো হয়েছে উদ্যানে অবস্থিত দোকানগুলো।
উদ্যানে ঘুরতে আসা শাহেনা আক্তার ও বাবুল মিয়া বলেছেন, ‘এখানকার পরিবেশ দারুণ। ঘুরে আনন্দ পাওয়া গেছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ভালো।’
একই ধরনের মন্তব্য করেন সুজন মিয়া, কামাল মিয়া, শাহেদা আক্তার ও বিলকিস বেগম।
সাতছড়ি উদ্যানের কাউন্টার ম্যানেজার মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘ঈদে পর্যটকদের বরণে প্রস্তুতি ছিল আগে থেকেই। পর্যটকরা স্বাচ্ছন্দে ঘুরতে পারছেন।’
সাতছড়ি বন্যপ্রাণী বিট কর্মকর্তা মো. মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘সাতছড়িতে প্রচুর বন্যপ্রাণী আছে। আছে নানা প্রজাতির গাছ। মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘুরে পর্যটকরা আনন্দিত।’
সাতছড়ি বন্যপ্রাণী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, ‘সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে পর্যটকদের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিষ্কার করা হয়েছে বসার আসনগুলো।’
তিনি জানান, করোনার কারণে প্রথম দফায় ২০২০ সালের ১৯ মার্চ পর্যটন স্পটটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এর পর থেকে প্রায় ৮ মাস বন্ধ থাকার পর ১ নভেম্বর এ উদ্যান খুলে দেওয়া হয়। করোনা পরিস্থিতির অবনতি হলে হলে ২০২১ সালের ১ এপ্রিল পুনরায় উদ্যান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এর প্রায় সাড়ে তিন মাস পর ২১ আগস্ট আবার উদ্যান খুলে দেওয়া হয়। করোনা নিয়ন্ত্রণে থাকায় এবারের ঈদে পর্যটকের ঢল নেমেছে।

জানা গেছে, সাতছড়িতে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৫ হাজার পর্যন্ত পর্যটক আসেন। বয়স্কদের টিকিট ৩০ টাকা এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ২৫ টাকা। একইভাবে কালেঙ্গায় টিকিট কেটে প্রবেশ করতে হয়। ১৯১২ সালে প্রায় ১০ হাজার একর দুর্গম পাহাড়ি জমি নিয়ে গঠিত রঘুনন্দন হিলস রিজার্ভই কালের পরিক্রমায় ৪ হাজার ৩৫৩ একর জমিতে আজকের উদ্যান। অবশ্য জাতীয় উদ্যান হওয়ার ইতিহাস বেশি দিনের নয়। ২০০৫ সালে ৬০০ একর জমিতে জাতীয় উদ্যান করা হয়। এ উদ্যানের ভেতরে আছে অন্তত ২৪টি আদিবাসী পরিবারের বসবাস। আছে বন বিভাগের লোকজন।
পর্যটকদের জন্য চালু আছে প্রজাপতি বাগান, ওয়াচ টাওয়ার, হাঁটার ট্রেইল, খাবার হোটেল, রেস্ট হাউস, মসজিদ, রাত যাপনে স্টুডেন্ট ডরমিটরি। উদ্যানে দুই শতাধিক প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্যে শাল, সেগুন, আগর, গর্জন, চাপালিশ, পাম, মেহগনি, কৃষ্ণচূড়া, ডুমুর, জাম, জামরুল, সিধা জারুল, আওয়াল, মালেকাস, আকাশমনি, বাঁশ, বেত ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ১৯৭ প্রজাতির জীবজন্তুর মধ্যে প্রায় ২৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ৬ প্রজাতির উভচর। আরও আছে প্রায় ২০০ প্রজাতির পাখি। আছে লজ্জাবতী বানর, উল্লুক, চশমা পরা হনুমান, শিয়াল, কুলু বানর, মেছো বাঘ, মায়া হরিণ প্রভৃতি। সরীসৃপের মধ্যে আছে কয়েক জাতের সাপ। কাও ধনেশ, বন মোরগ, লাল মাথা ট্রগন, কাঠঠোকরা, ময়না, ভিমরাজ, শ্যামা, ঝুটিপাঙ্গা, শালিক, হলদে পাখি, টিয়া প্রভৃতির আবাসস্থল এই উদ্যান।